,
সংবাদ শিরোনাম :

২১আগস্ট গ্রেনেড হামলা ॥ বাবর-পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড, তারেকের যাবজ্জীবন

bdmorning

এফএনএস: ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ১৪ বছর আগে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীবিরোধী সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় এসেছে আদালতে। খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান,খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদন্ড। এছাড়া এ মামলার আসামি ১১ সরকারি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন গতকাল বুধবার সকালে আলোচিত ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় এই রায় ঘোষণা করেন। ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন; আহত হন কয়েকশ নেতাকর্মী। সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান আজকের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গ্রেনেডের প্রচন্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়। খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ মোট ৪৯ জন এ মামলার আসামি। শেখ হাসিনাকে হত্যা করে দলকে নেতৃত্বশূন্য করতেই এই হামলা হয়েছিল এবং তাতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে এ মামলার তদন্তে উঠে আসে। হামলার পরদিন মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। থানা পুলিশ, ডিবির হাত ঘুরে সিআইডি এই মামলার তদন্তভার পায়। ঘটনার চার বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যার অভিযোগ এবং বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। জঙ্গি দল হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ২২ জনকে সেখানে আসামি করা হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর অভিযোগ গঠন করে তাদের বিচারও শুরু হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে। সিআইডির বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩ জুলাই আসামির তালিকায় আরও ৩০ জনকে যোগ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন। সেখানে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ চার দলীয় জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের নাম আসে। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ সম্পূরক অভিযোগপত্রের আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। নতুন করে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। রাষ্ট্রপক্ষের ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে মোট ২২৫ জন এ মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দেন। জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামির সবাই আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তাদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন ২০ জন। রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ এজলাসে ১২০ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলা দুটি রায়ের পর্যায়ে আসে। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু জানান, দন্ডবিধি ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলার বিচার কাজ একই সঙ্গে চলে। সব মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৪৫৪ কার্যদিবস আদালত বসেছে এ মামলা শোনার জন্য। মামলার সাক্ষীদের মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন ১৪ জন। আর আসামিদের মধ্যে ১৩ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে এ মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অধিকতর তদন্তে উঠে আসে। জানা যায়, হামলার বিষয়ে নোয়াখালীর জজ মিয়ার ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দেওয়ার বিষয়টি ছিল নাটক। আওয়ামী লীগ নেতারা বলে আসছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট হামলার পর থেকেই তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে কাজ শুরু করে। এমনকি শুরুতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে করা মামলাও পুলিশ নেয়নি। বরং হামলার অনেক আলামত সে সময় নষ্ট করে ফেলা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নেতারা সে সময় ওই হামলার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেন। প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ওই হামলায় জড়িত বলেও সে সময় প্রচার চালানো হয়। হামলার পর বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল চারদলীয় জোট সরকার। ৪০ দিনের মাথায় ওই কমিশনের দেওয়া ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থা ওই হামলায় জড়িত। পরের বছর নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে সিআইডি। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়। আদালতে সেই সাজানো জবানবন্দিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদের নির্দেশে তিনি পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যান্যের সঙ্গে ওই হামলায় অংশ নেন। কিন্তু বিএনপির সেই সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে ২০০৬ সালের অগাস্টে জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, তার ছেলে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে সিআইডিই তাদের ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছিল। জজ মিয়াকে রাজসাক্ষী হওয়ারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার চার বছর পর তদন্তে হাত দিয়ে আবদুল কাহার আকন্দ এই হামলার পেছনের ঘটনা তুলে আনেন, দেন সম্পূরক অভিযোগপত্র। সেখানে বলা হয়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে গ্রেনেড হামলার পুরো ঘটনাই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। সিআইডির এই কর্মকর্তার তদন্তেই শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার এই মামলায় তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সম্পৃক্ততা উঠে আসে। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল যুক্তিতর্ক শুনানিতে বলেন, অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে এ মামলায় মূল রহস্য উদঘাটন হয়েছে। ঘটনার পরিকল্পনাকারীদেরও ওই অভিযোগপত্রে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। দেশ তখন পরিচালিত হচ্ছিল হাওয়া ভবন থেকে। হাওয়া ভবনের নেতৃত্বে ছিলেন তারেক রহমান। তিনি যেভাবে চালাতেন, সেভাবে কাজ হত। তারেক রহমান পাওয়ারে থাকায় ওই কুটিল চক্র তার কাছে যায়। আর ওসব ব্যক্তির (জঙ্গি) সঙ্গে তারেক রহমানের সুসম্পর্ক থাকায় তারা সম্মিলিতভাবে ক্ষমতার থাকার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় সুবিধা দিয়ে ওই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, আসামিপক্ষ দুই মামলায় মোট পাঁচবার উচ্চ আদালতে যাওয়ায় এ বিচার মোট ২৯২ কার্যদিবস বিলম্বিত হয়েছে। তারা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনেও কালক্ষেপণ করেছেন। এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমাদের কারণে মামলার বিচার বিলম্বিত হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ ২২৫ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে, জেরা হয়েছে, এটা অবশ্যই সময় সাপেক্ষ। কোনো কিছু সংক্ষিপ্ত করার সুযোগ ছিল না। এ রায় অন্যায় ও বেআইনি: রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় তারেক রহমানের যাবজ্জীবন ও অন্যান্যের ফাঁসির যে রায় দেওয়া হয়েছে তা ‘অন্যায় ও বেআইনি। আদালতের রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিফলিত হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, হাওয়া ভবন, আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে কোনো স্বাক্ষী আইসা এ মামলায় সাক্ষ্য দেয় নাই। তারা এখানে বসে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা করেছে- এটা কোনো সাক্ষী বলে নাই। গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে’ তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাদের জড়িত করে দেওয়া বক্তব্য মুফতি হান্নান পরে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বলে দাবি করেন বিএনপির এই আইনজীবী। সানাউল্লাহ বলেন, মুফতি হান্নানকে ৪০০ দিন রিমান্ডে রেখে যে জবানবন্দি নিয়েছে, সেই জবানবন্দি প্রত্যাহার করে সে বলেছে, তারেক রহমানের সাথে, বিএনপি নেতাদের সাথে তার কোনো দিন দেখাই হয় নাই। এই মামলার কোনো সাক্ষী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও গোপন বৈঠকের অভিযোগের বিষয়ে কোনো সাক্ষ্য দেননি বলেও দাবি করেন তিনি। বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক বলেন, তারেক রহমান দেশে ফিরে আসলে তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন; আহত হন কয়েকশ নেতাকর্মী। সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান আজকের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গ্রেনেডের প্রচন্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়। শেখ হাসিনাকে হত্যা করে দলকে নেতৃত্বশূন্য করতেই এই হামলা হয়েছিল এবং তাতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে এ মামলার রায়ে উঠে আসে।

Share
[related_post themes="flat" id="273796"]

সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ॥ জিএম নুর ইসলাম, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, যশোর রোড, সাতক্ষীরা, ফোন ও ফ্যাক্স ॥ ০৪৭১-৬৩০৮০, ০৪৭১-৬৩১১৮
নিউজ ডেস্ক ॥ ০৪৭১-৬৪৩৯১, বিজ্ঞাপন ॥ ০১৫৫৮৫৫২৮৫০ ই-মেইল ॥ driste4391@yahoo.com