1. [email protected] : admin :
  2. [email protected] : Dailik Drishtipat : Dailik Drishtipat
বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

নারী দিবসে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

ইয়াসমিন নাহার, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সাতক্ষীরা
  • Update Time : রবিবার, ৭ মার্চ, ২০২১

চাকুরী সূত্রে আমার প্রতি নিয়ত মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। নারী বিচারক হওয়ার কারণে মহিলা ও শিশু ভিকটিম এর জবানবন্দী গ্রহণ করি। ঠিক তেমনি ধারাবাহিকতায় গতদিন এক ভিকটিম এর জবানবন্দী নেয়ার সময় আমার মন ও মনন বিষন্ন হয়ে পড়ে, মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি দেখে মন ভয়ে আতঙ্কে প্রকম্পিত হয়ে উঠে। মেয়ে শিশুটি তার সৎ পিতার নিকট ধর্ষণের শিকার হয়েছে এমনকি সেই সৎ পিতাও তার স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দীতে স্বীকার করেছে যে, সে আসলেই এই গর্হিত কাজটি করেছে এবং সে অনুতপ্ত! শিশুটি এবং আসামী উভয়েই বলেছে পাঁচ বছর বয়স হতে সুদীর্ঘ সাত বছর সেই সৎ পিতার নিকট সে মানুষ হচ্ছে কিন্তু ভাবার বিষয় হচ্ছে এতো ছোট থেকে লালন পালনের পরেও পিতৃত্ব সুলভ আচরণ না করে পশু সুলভ আচরণ করতে পিছপা হয় নি এই কথিত সৎ পিতা। এটি আমাদের সমাজের খন্ড চিত্র মাত্র কিন্তু বাস্তব অবস্থা শৈলখন্ডের মতো যার প্রকৃত চিত্র আরো গভীর, আরো বেদনা দায়ক। নারীরা আর কন্যা শিশুরা আসলেই ভীষণ অনিরাপদ আমাদের বর্তমান সমাজে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কোথাও নারীর জন্য কোন নিরাপত্তা নেই। আমি তথাকথিত কোন নারীবাদী নই কিন্তু নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিনিয়ত দেখছি নারীরা কতোটা অনিরাপদ। যৌন হয়রানী মামলায় এমন এমন ছোট শিশু আসে আমি নিজেই বিব্রত হই তাকে কি প্রশ্ন করবো এই বিষয় নিয়ে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় জমি জমা নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নিজের পিতা কন্যা শিশুকে ভিকটিম বানায়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। এক্ষেত্রেও কিন্তু সেই কন্যা শিশুটি নিজের পিতা বা পরিবার দ্বারা ভিকটিক এ রূপান্তরিত হয় আর মেডিকেল, থানা, আদালতে ঘুরতে ঘুরতে বিচিত্র অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হয়, হারায় তার বর্ণিল শৈশব, কৈশোর আর বড় হয় রূঢ় বাস্তবতা নিয়ে। আরো কষ্টকর বিষয় হলো ধর্ষণের মতো ঘটনায় পিতা মাতা টাকার বিনিময়ে আপোষ করে ফেলে আর সেই টাকা পিতা তার নিজের সাংসারিক প্রয়োজনে ব্যয় করে মেয়েটার ভবিষ্যতের কোন চিন্তা না করেই। এমনকি প্রতিবন্ধী মেয়ের ক্ষেত্রেও এরূপ ঘটনা অহরহ ঘটছে। একবার আমি প্রতিবন্ধীদের একটি কর্মশালায় অংশগ্রহণ করলে সেখানে তথ্য উপাত্ত দিয়ে দেখানো হয় কিভাবে প্রতিবন্ধী নারী এসব গর্হিত ঘটনায় নিজের পরিবারের কারণে অবিচারের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে বাক প্রতিবন্ধী ও বধির যারা তাদের ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রকাশ করতে না পারার কারণে অনেকক্ষেত্রেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে আর পিতৃ পরিচয়হীন সন্তানের জন্ম দিয়ে অন্ধকার ভবিষ্যত আর বিড়ম্বনার দূর্বিষহ জীবন পার করতে থাকে। একবার ভারতীয় এক চ্যানেলে আমির খানের একটি প্রোগ্রামে জরীপ করে বের করেছিলো নারীরা কোথায় সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হয়রানীর শিকার হয়। উপস্থিত দর্শরা বলেছিল – রাস্তায়, রেল স্টেশন বা বাস স্ট্যান্ডের মত বিপুল জনসমাগম স্থানে নারীরা বেশি নির্যাতন ও হয়রানীর শিকার হয়। কিন্তু সঞ্চালক আমির খান দুঃখের হাসি হেসে বলেছিলেন, না, নারীরা সবচেয়ে বেশী নির্যাতন ও হয়রানীর স্বীকার হয় নিজ পরিবারের মধ্যে। যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণের মতো ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে পরিচিতজন, আতœীয়- স্বজনের মধ্যে আর যৌতুকের জন্য নির্যাতন তো বলায় বাহুল্য। মেয়ে শিশু ছোট থেকেই চোখে চোখে রাখতে হয় কোথায় গেল, কার সাথে মিশলো, কার বাড়ি বেড়াতে গেল। মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়ে একটু বড় হলেই বিয়ে দিতে পারলেই মান সম্মান যেন বাঁচে। কিন্তু অনেক মেয়েরই শ্বশুর বাড়িতে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হয়। এখন শুধু নগদ টাকায় কেউ যৌতুক চায় না, আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলায়ে মোটর সাইকেল, দামী স্মার্ট ফোন, ফ্রিজ এবং হাল আমলে ফ্লাটের জন্য আবদার করা হয়। বলা হয় সবই মেয়ের সুখের জন্য। ছেলের সুখের জন্য কিছু করা হয় না সে প্রশ্ন অবশ্যই থেকেই যায়। স্কুল – কলেজে বিদ্যা শিক্ষার জন্য মেয়ে পাঠিয়েও যেন শান্তি নেই। পিতাই যেখানে ভরসার পাত্র হয় না, সেখানে পিতৃসম শিক্ষকের উপর কিভাবে ভরসা করা যায়? শিক্ষকের হাতে যৌন নিপীড়ন এর ঘটনা কিছু হয়তো পত্র পত্রিকায় আসে আর বিপুল অংশই কোন রিপোর্ট হয় না। মান সম্মানের ভয়ে অধিকাংশ মেয়ে এবং তাদের পরিবার চুপ হয়ে যায়, বড়জোর অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করায়। বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ হলেও সেখানেও কিন্তু যৌন নির্যাতন থেমে নেই। বরং বিশেষ এ্যাসাইনমেন্ট এর নামে শিক্ষার্থীকে নিজ কক্ষে ডেকে নানাভাবে হয়রানী চলে আর কোন শিক্ষার্থী যদি সাড়া না দেয় তবে কোর্স পরীক্ষায় কোন ছল ছুতায় ফেল করানো হয় বা সর্বনিম্ন নাম্বার দেয়া হয়। বলা হয় অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারী আত্মবিশ্বাসী এবং যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম। কিন্তু কর্মজীবী নারীরাও কর্মক্ষেত্রে এবং আসা যাওয়ার পথে নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। নানা অভিনয় উপায়ে চলে এই নির্যাতন। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের দ্বারাও নারীদেয় হেনস্থা করা হচ্ছে। সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় পড়ে যখন কোন নারী প্রেমে প্রতারিত হয়ে নেট দুনিয়ায় তার অশ্লীল স্থির চিত্র বা কোন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেই নারী ও তার পরিবারকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হয়। এভাবে সাইবার বুলিং ও সাইবার ক্রাইম চলছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই নিরাপত্তাহীনতা থেকে নারীরা রক্ষা পাবে কিভাবে? এর এককথায় কোন উত্তর নেই। কিন্তু নারীদের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন সচেতন থাকা, প্রতিবাদী হওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। নিজের শিশু সন্তানের ক্ষেত্রে হোক আর নিজের ক্ষেত্রে হোক যেকোন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন। লজ্জা আর ভয়ে চুপ করে না থেকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করুন, আইনের আশ্রয় গ্রহণ করুন। মনে রাখতে হবে অনলাইন দুনিয়ায় কেউ যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও তার জন্য বিশেষ আইন রয়েছে এবং পুলিশের একটি বিশেষ টিম কাজ করে যাচ্ছে। পরিবারের যারা পুরুষ সদস্য আছেন তারা বাচ বিছার না করে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই নারীদের দিকে দোষারোপের তীর নিক্ষেপ না করে সহান সহানুভূতিশীল মন নিয়ে নারীদের পাশে দাঁড়ান, রাস্তা ঘাটে কোন নারীদের প্রতি কোন অন্যায় দেখলে নির্দ্বিধায় প্রতিবাদ করুন। আমাদের মনে রাখা উচিৎ যেকোন নারী যৌন হেনস্থার শিকার হতে পারেন তা তিনি যে ধরণের পোষাকই পরিধান করুন না কেন কারণ যারা এই ধরণের হেনস্থা করে, তাদের মন মানসিকতা অত্যন্ত কলুষিত, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য সবার একসাথে একযোগে সচেতনভাবে কাজ করতে হবে। পরিবারের কোন সদস্য বা কোন আতœীয় স্বজন বা কোন পরিচিত জন কোন নারী সদস্যের প্রতি যৌন নিপীড়ন করলে অবশ্যই কঠিন অবস্থান গ্রহণ করুন। নারীর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ হলেই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে উঠবে, মেয়েশিশু বর্ণিল শৈশব ও কৈশোর পাবে। নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলাই হোক নারী দিবসের অঙ্গীকার অন্যথায় বছরের একটি দিন বেগুনী রঙের পোষাক পরে সভা সমাবেশে কন্ঠের চর্চা করা নিরর্থক বৈকি!

শেয়ার

আরও খবর
© All rights reserved © 2020 dainikdristipat.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazardristip41